
নতুন প্রজন্মের উপলব্ধি শেখ মুজিবের ছবি দেখিয়ে ১৯৭৫ সাল থেকে আমাদের কীভাবে শোষণ করা হয়েছে—নতুন প্রজন্ম এখন সেই পুরোনো হিসাব নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। দীর্ঘদিনের দুঃশাসন থেকে মুক্তি পেতে এই নতুন প্রজন্মই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাদের দেশ ও রাজনীতি থেকে সরিয়ে দিয়েছে। তাদের বিগত দুঃশাসনে আমাদের রাজনীতি, অর্থনীতি, সামাজিক মূল্যবোধ এবং আইনের শাসন গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; পাশাপাশি বিস্তার ঘটেছিল সীমাহীন দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির।
এখন নতুন করে পালিয়ে যাওয়া দলের লোকজন ফেসবুকে যতই সরব থাকুক না কেন, সাধারণ মানুষ আসলে কী চায়—সময়ই তা বলে দেবে। কয়েকজন কথিত সুপারস্টার বা পরিচিত মুখকে সামনে রেখে যতই প্রচারণা চালানো হোক, একদিন হয়তো দেখা যাবে—সাধারণ মানুষ তাদের পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে আনফলো করে দিয়েছে।
ফেসবুকে কিছু মানুষকে হয়তো সাময়িকভাবে প্রভাবিত করা যায়, কিন্তু বাস্তবতার চিত্র অনেক ভিন্ন। যারা দেশের মানুষের ওপর অন্যায় করেছে, তাদের কর্মকাণ্ডের হিসাব মানুষ সহজে ভুলে যাবে—এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। এই তরুণ প্রজন্ম অতীতের কোনো কিছুই ভুলবে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মূল্যায়ন আরও স্পষ্ট হবে। ডিসেম্বর বা অন্য কোনো সময় নিয়ে যতই রাজনৈতিক কথা বলা হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত জনগণের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
আগামীতে কে আসবে, কে থাকবে আর কে শুধু ফেসবুকেই সরব থাকবে—সময়ই তার সঠিক উত্তর দেবে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট আকস্মিক কোনো ঘটনা ছিল না; এটি ছিল তৎকালীন সরকারের দীর্ঘদিনের সীমাহীন অপশাসন, দুঃশাসন এবং চরম জনদুর্ভোগের বিরুদ্ধে এক অনিবার্য বিস্ফোরণ। বিরোধী মত দমনের নামে গঠিত রক্ষীবাহিনী সে সময় দেশজুড়ে এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। ভিন্নমতের প্রায় ৪০ হাজারের বেশি মানুষকে নির্মমভাবে হত্যার পাশাপাশি রাতের আঁধারে সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে ঢুকে সুন্দরী নারীদের তুলে নিয়ে যাওয়ার মতো ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছিল। রাষ্ট্রের সর্বস্তরে চরম দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও লুটপাটের কারণে দেশের অর্থনীতি পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল।
এই নীতিগত ব্যর্থতার চরম মূল্য দিতে গিয়ে ১৯৭৩ সালের দুর্ভিক্ষে ১৫ থেকে ৩০ লক্ষ মানুষ অনাহারে প্রাণ হারায়। অথচ যখন দেশের লাখো মানুষ না খেতে পেয়ে পাগলপ্রায়, তখন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় শেখ কামালের রাজকীয় বিয়ের জমকালো আয়োজন করা হয়েছিল।
শুধু অভ্যন্তরীণ নিপীড়নই নয়, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে বিপন্ন করার সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রও তখন ডালপালা মেলছিল। নিয়মিত ও শক্তিশালী জাতীয় সেনাবাহিনীকে দুর্বল বা বিলুপ্ত করে দলীয় রক্ষীবাহিনীকে দেশের নিরাপত্তার মূল স্থানে বসানোর পাঁয়তারা চলছিল। এটি ছিল মূলত বাংলাদেশকে এক পরাধীনতার শৃঙ্খলে আটকে ফেলে ভারতের অধীনে নিয়ে যাওয়ার এক গভীর চক্রান্ত। এই দীর্ঘদিনের জুলুম, হত্যাযজ্ঞ, লুণ্ঠন থেকে দেশমাতৃকাকে রক্ষা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষার তাগিদেই একদল দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তা ও সৈনিক ১৫ আগস্টের ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণে বাধ্য হন। এর মাধ্যমেই অবসান ঘটে দেশের ইতিহাসের এক অন্ধকারতম অধ্যায়ের এবং জনগণ মুক্তি পায় ভয়াবহ এক অপশাসনের কবল থেকে। এই মুক্তির পথ প্রশস্ত করায় আমাদের বীর নায়ক মেজর ডালিমসহ সেদিনের সকল দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধাকে জাতি আজ ধন্যবাদ জানায়।
লেখক,
মোঃ রাসেল সরকার
সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী,
চেয়ারম্যান, যুব শক্তি সামাজিক আন্দোলন “বাংলাদেশ”।
Leave a Reply