
বিশেষ প্রতিনিধি:
চট্টগ্রামে বিএনপির একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক সভাকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ এক অনিয়ম ও চরম বিশৃঙ্খলার চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রাম, মামলা, হামলা ও কারা নির্যাতনের শিকার ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের বঞ্চিত করে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট বিতর্কিত ব্যক্তিদের গলায় বিএনপির ডেলিগেট কার্ড ঝুলে থাকার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
বিশেষ করে, এই ঘটনাটি কেবল অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা পদবঞ্চিত ক্ষোভের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং রাষ্ট্রের অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়—‘প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা’ এবং দলের শীর্ষ নেতৃত্বের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি জড়িত একটি বড় প্রশ্ন হিসেবে সামনে এসেছে।
গত শনিবার নগরের বিলাসবহুল হোটেল রেডিসন ব্লুতে বিএনপির ওই সাংগঠনিক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা চলাকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিওতে দেখা যায়, আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং বিতর্কিত ব্যক্তিরা গলায় অফিশিয়াল ডেলিগেট কার্ড ঝুলিয়ে দর্দোচিতভাবে ভেতরে প্রবেশ করেছেন।
এদিকে, দীর্ঘ ১৭ বছরের দুঃসময়ে দলের জন্য জেল-জুলুম সহ্য করা শত শত তৃণমূল নেতাকর্মী কার্ডের অভাবে হোটেলের বাইরে অবস্থান করতে বাধ্য হন। কার্ড না পেয়ে রেডিসন ব্লুর বাইরে বিক্ষোভ ও স্লোগান দেন ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা। তাদের এই আর্তনাদ ও প্রতিবাদের ভিডিও ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।
তৃণমূলের প্রশ্ন—”আওয়ামী লীগের নেতাদের গলায় যদি ডেলিগেট কার্ড শোভা পায়, তবে ১৭ বছর রাজপথে লড়াই করার অপরাধ কী?” এই ন্যক্কারজনক ঘটনার পর স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের শীর্ষ নেতারা তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। চট্টগ্রাম মহানগর ও উত্তর-দক্ষিণ জেলা বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা সংবাদমাধ্যমকে জানান, বিষয়টি দলের হাইকমান্ডের নজরে আনা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির এক শীর্ষ নেতা বলেন, যারা গত ১৭ বছর আওয়ামী ফ্যাসিবাদের দোসর হিসেবে মাঠে থেকে আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর দমনপীড়ন চালিয়েছে, আজ তারা কীভাবে বিএনপির ডেলিগেট কার্ড পায়? এটি আমাদের আন্দোলন ও শহীদের রক্তের সঙ্গে বেঈমানি। কারা এই তালিকা তৈরি করেছে এবং কাদের অদৃশ্য ইশারায় রেডিসনের মতো একটি সুরক্ষিত স্থানে এদের প্রবেশাধিকার দেওয়া হলো, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এর সঙ্গে দলের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা কোনো সিন্ডিকেট জড়িত থাকলে তাদের ছাড় দেওয়া হবে না।” তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ, যারা দুঃসময়ে নেতাকর্মীদের পাশে ছিলেন না, উল্টো আওয়ামী নেতাদের সেবা করতেন কিংবা তোষামোদ করতেন, তারাই এখন ব্যক্তিগত তদবির ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে কার্ড বাগিয়ে নিয়েছেন।
এই পুরো ঘটনার নেপথ্যে বেশ কিছু গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক ও ভিভিআইপিদের নিরাপত্তাবলয়ে ঘেরা একটি গুরুত্বপূর্ণ সভায় ফ্যাসিবাদের দোসরদের প্রবেশাধিকার কীভাবে নিশ্চিত হলো? এটি কি নিরাপত্তা ব্যবস্থার মারাত্মক কোনো ত্রুটি, নাকি বড় কোনো নাশকতার সুদূরপ্রসারী চক্রান্ত? কার্ড বিতরণের মূল তালিকাটি কারা প্রস্তুত করেছিলেন এবং কোন প্রক্রিয়ায় যাচাই-বাছাই করা হয়েছিল? আর্থিক সুবিধা বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে এই কার্ডগুলো বিতরণ করা হয়েছে কি না, তার নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
দলের সাধারণ কর্মীরা বলেন, অতি দ্রুত ডেলিগেট তালিকা জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। বিগত ১৭ বছরের ত্যাগী নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে বিতর্কিতদের পুনর্বাসনের এই অপচেষ্টা দলের ভিত্তিকে দুর্বল করছে। স্থানীয় বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মী ও সচেতন মহলের দাবি, এই ঘটনার নেপথ্যে থাকা কুশীলবদের দ্রুত চিহ্নিত করে কঠোর সাংগঠনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হোক, যাতে ভবিষ্যতে দেশের ও দলের নিরাপত্তা নিয়ে কেউ ছিনিমিনি খেলতে না পারে।
Leave a Reply