
বিশেষ প্রতিবেদন,
ঢাকা: শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) ঢাকা মেট্রো সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হাসান শওকতের বিরুদ্ধে নির্মাণকাজ অর্ধেক সম্পন্ন রেখেই শতভাগ বিল পরিশোধ এবং দপ্তরে বসে বস্তাভরে ঘুষ লেনদেনের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। খাতা-কলমে শতভাগ কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যেই তিন সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
সম্প্রতি ঠিকাদারদের সঙ্গে টাকা লেনদেনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে। যদিও অভিযুক্ত ও সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ দাবি করেছেন, ভিডিওর ওই অর্থ ঘুষের নয়, বরং পারফরম্যান্স গ্যারান্টির; তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত তদন্ত সাপেক্ষ।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, পুরান ঢাকার শেরেবাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়ের একটি একাডেমিক ভবন নির্মাণে বড় ধরনের অনিয়ম হয়েছে। নথিপত্র অনুযায়ী, ১০ তলা ভবনের নির্মাণকাজ ২০২১ সালে সম্পন্ন দেখানো হয় এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘বিল্ডার্স-সিডব্লিউবিডি জেভি’ বিল জমা দেওয়ার পর ইডিডির প্রকৌশলীরা গুণগত মান পরিদর্শন শেষে ২০২২ সালের ১৩ জুন বিল ছাড় করেন। তবে সরেজমিনে দেখা যায়, ভবনটি বর্তমানে অষ্টম তলা পর্যন্ত নির্মিত রয়েছে এবং নবম ও দশম তলার কোনো অবকাঠামো নেই। অথচ নথিতে ভুয়া পরিমাপ দেখিয়ে নবম ও দশম তলার ছাদ, ঢালাই, রড ও ওয়াটার প্রুফিংসহ বিভিন্ন কাজের বিপরীতে প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে মো. হাসান শওকত এই অর্থ ছাড়ের অনুমোদন দেন।
এ বিষয়ে শেরেবাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ রোজিনা শাহীন এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান লিয়াকত শিকদারের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। শুধু শেরেবাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয় নয়, রাজধানীর আরও কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাজের অগ্রগতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিল দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২২ সালের জুন মাসে বিদ্যুৎ সংস্কারকাজের জন্য ১১ লাখ ৬৮ হাজার টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়। তৎকালীন মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস হোসেনের প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স মেড-ইন বাংলাদেশ’-কে ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে কাজটি সম্পূর্ণ দেখিয়ে ৮ লাখ টাকা এবং পরবর্তীতে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বাকি ৩ লাখ ৬৮ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, প্রথম বিল দেওয়ার সময় কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৬ তলা ভবন নির্মাণের জন্য ‘মেসার্স এমএসবি-এমসিবিএল জেভি’-কে কাজ ছাড়াই ১০ লাখ টাকা বিল দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া কোতোয়ালি থানার আনোয়ারা বেগম মুসলিম গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজে কাজ না করেই ১৯ লাখ টাকা পরিশোধের অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিবেদনে ২০২২ সালের চারটি ভিডিও ফুটেজের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে প্রকৌশলী হাসান শওকতকে তার সরকারি অফিসের কক্ষে বসে থাকতে দেখা যায়। ভিডিওতে টেবিলের ওপর বস্তা ও ব্যাগভর্তি নগদ টাকা দেখা যায় এবং ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের প্রচার সম্পাদক রাকিব হোসেন মিরনসহ কয়েকজন ঠিকাদারকে টাকা গুনতে দেখা যায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঠিকাদার দাবি করেন, কাজ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে প্রকৌশলী হাসান শওকত এক ঠিকাদারের কাছ থেকে ২ কোটি টাকা ঘুষ নিয়েছেন। এদিকে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী যুবলীগের প্রচার সম্পাদক রাকিব হোসেন মিরন ‘M/S Miron Enterprise’ ও ‘M/S Meron Enterprise’-এর মাধ্যমে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে বড় অঙ্কের কাজ বাগিয়ে নিয়েছেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সরকারি নথি অনুযায়ী, চাকরির সুবাদে হাসান শওকত নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ অর্জন করেছেন। তার স্ত্রী ফেরদৌসী খানমকে গৃহিণী হিসেবে দেখানো হলেও তার নামে খুলনার ডুমুরিয়া, দিঘলিয়া, মেহেরপুর ও মাগুরাসহ বিভিন্ন এলাকায় মোট ১৮৪.৩৩ শতক জমি রয়েছে। এ ছাড়া ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট থানাধীন বরুয়া এলাকায় জমির ওপর আলিশান বাড়ি এবং দক্ষিণখান এলাকায় নিজের ও স্ত্রীর নামে ১০ তলা ভবন থাকার তথ্য উঠে এসেছে।
টাকা লেনদেনের ভিডিও প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হাসান শওকত দাবি করেন, ঠিকাদাররা নিজেদের মধ্যে টাকা বিনিময় করছিলেন এবং এর মধ্যে তাকে পাঁচ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছিল। তবে ঠিকাদাররা কেন তার কক্ষে টাকা লেনদেন করছিলেন এবং তাকে ওই অর্থ কেন দেওয়া হলো—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি এটিকে ষড়যন্ত্র বলে উল্লেখ করেন। কাজ না করে বিল উত্তোলন ও সম্পত্তির বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. তারেক আনোয়ার জাহেদী এ বিষয়ে বলেন, “এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা, নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে এই অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়ায় জড়িত প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
Leave a Reply