
বিশেষ প্রতিনিধি;
ঢাকা ওয়াসার সুপেয় পানির বিশেষ প্রকল্প 'ওয়াটার এটিএম' পরিচালনা নিয়ে গুরুতর অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা, স্বচ্ছতার ঘাটতি এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয়ের অভিযোগ উঠেছে। উন্মুক্ত দরপত্র (OTM) কিংবা পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) নীতিমালা অনুসরণ না করে কোনো ধরনের উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা ছাড়াই 'ড্রিঙ্কওয়েল' (উইস্ট বাংলাদেশ লিমিটেড)-এর সঙ্গে চুক্তি নবায়নের গোপন তৎপরতা চলছে বলে জানা যায়।
ফ্যাসিস্ট ও নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে ক্ষমতার প্রভাব বলয় এবং ঢাকা ওয়াসার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তাকসিম এ. খানের সময়কালে ড্রিঙ্কওয়েল বিনাপুঁজিতে শতকোটি টাকার ওয়াটার এটিএম ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নেয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং তাকসিম এ. খানের পদত্যাগের পরও সেই প্রভাববলয়ের তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে দাবি সূত্রগুলোর। বরং ওয়াসার অভ্যন্তরের একটি প্রভাবশালী আমলাতান্ত্রিক গোষ্ঠীর সহযোগিতায় নতুন মোড়কে ড্রিঙ্কওয়েলের সঙ্গে চুক্তি বহাল রাখার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, দেশের বিদ্যমান আইন-বিধি তথা পিপিআর এবং পিপিএ প্রতিপালন ব্যতিরেকে কোন ধরনের উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়া "গোপন চুক্তির" আওতায় কাজ বাগিয়ে নেয়ার পর; পুনরায় পাঁচ বছরের জন্যে চুক্তি নবায়ন করার নিমিত্তে ড্রিঙ্কওয়েল কোম্পানির কো-ফাউন্ডার ও সিইও মিনহাজ চৌধুরী ঢাকা ওয়াসাসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে দৌড়ঝাপ শুরু করেছেন। বর্তমানে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত দরপত্র (ওটিএম) বা পিপিপি নীতিমালার তোয়াক্কা না করে, পর্দার আড়ালে পুনরায় ড্রিঙ্কওয়েল কোম্পানির সঙ্গেই চুক্তি নবায়নের জোর অপতৎপরতা ও দৌড়ঝাঁপ চলছে বলে জানাগেছে। গত (২৯/৬/২০২৬) ড্রিঙ্কওয়েল (উইস্ট বাংলাদেশ লিমিটেড) এর পক্ষ থেকে আরো পাঁচ বছরের জন্যে চুক্তি নবায়নের নিমিত্তে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বরাবর আবেদন করা হয়েছে।
বিগত নয় বছরে বিনা বিনিয়োগে ড্রিঙ্কওয়েল কোম্পানি 'ওয়াটার এটিএম' বুথের বিক্রিত পানির টাকা থেকে প্রায় ১৪০ কোটি হাতিয়ে নিয়েছে। ঢাকা ওয়াসা কর্তৃপক্ষ 'ওয়াটার এটিএম বুথের অবকাঠামো নির্মান বাবদ ব্যয় করেছে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা। সে হিসাবে 'ওয়াটার এটিএম' বুথের প্রকল্পে সরকারের লোকসান হয়েছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। ওয়াসা ভবনে ড্রিঙ্কওয়েল (উইস্ট বাংলাদেশ লিমিটেড) এর ব্যবহৃত অফিসের বাজার দর অনুযায়ী মাসিক ভাড়া হয় ৫ লাখ টাকা। অফিস ভাড়া বাবদ নয় বছরে প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা গচ্চা দিয়েছে ঢাকা ওয়াসা।
ঢাকা ওয়াসার 'ওয়াটার এটিএম' প্রকল্পের সকল অবকাঠামো ও বিনিয়োগ ঢাকা ওয়াসার। কেবল পানি বিক্রির টাকা ঢাকা ওয়াসার না। ঢাকা ওয়াসার বিনিয়োগে ঢাকা শহরে ২৯৪টি 'ওয়াটার এটিএম' বুখের বিক্রিত পানির টাকা নিয়ে যাচ্ছে আমেরিকান নাগরিক মিনহাজ চৌধুরীর মালিকানাধিন ড্রিঙ্কওয়েল কোম্পানি। এমনকি বিনা পুঁজিতে ব্যবসা বাগিয়ে নেয়া ড্রিঙ্কওয়েল কোম্পানি ঢাকা ওয়াসা ভবনে ফ্রি অফিসও ব্যবহার করছেন।
অনুসন্ধানে জানাগেছে, ব্যবসায়িক পার্টনার হচ্ছেন ঢাকা ওয়াসার সাবেক এমডি এবং ফ্যাসিস্ট আওয়ামী দোসর তাকসিম এ. খান। মূলত: কর্পোরেট ফ্যাসিস্ট খ্যাত ঢাকা ওয়াসার সাবেক এমডি তাকসিম এ. খান আমেরিকান নাগরিক এবং ফ্যাসিস্ট আওয়ামী দোসর মিনহাজ চৌধুরীর মাধ্যমে পরোক্ষভাবে ব্যবসা করে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। এজন্যে ঢাকা ওয়াসার সংশ্লিষ্ট মহল হাস্যরস করে বলেন- খায়-দায় ওয়াসিম মোটা হয় তাকসিম অর্থাৎ এটিএম বুথে সকল বিনিয়োগ করে ঢাকা ওয়াসা আর বিনা পুঁজিতে পরিচালনার নামে ব্যবসার মুনাফা লুটে নিয়ে ফুলে ফেঁপে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে যাচ্ছে ড্রিঙ্কওয়েল কোম্পানি।
বিস্ময়কর বিষয় হচ্ছে, ৫ আগস্ট-২৪ তারিখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বহুল বিতর্কিত ও সমালোচিত তাকসিম এ. খান ঢাকা ওয়াসার এমডি পদ থেকে পদত্যাগ করে আত্মগোপনে চলে যান। তাকসিম এ. খান পলায়নের পর ঢাকা ওয়াসায় এখন পর্যন্ত একাধিকবার এমডি পরিবর্তন হয়েছে। অথচ তাকসিম এ. খানের পরোক্ষ পার্টনারশীপ থাকা ড্রিঙ্কওয়েল কোম্পানির সাথে "অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক" চুক্তি আজ পর্যন্ত বাতিল করা হয়নি। বরং ড্রিঙ্কওয়েল কোম্পানিকে পুনরায় পরিচালনার কাজ দেয়ার জন্যে উঠে পড়ে লেগেছে ঢাকা ওয়াসার তাকসিমের দোসর কতিপয় কর্মকর্তা। যারা ড্রিঙ্কওয়েল কোম্পানি থেকে নিয়মিত মাসোহারা ও উপঢৌকন পাচ্ছেন বলে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানাগেছে।
বিনা পুঁজিতে ব্যবসা বাগিয়ে নেয়া ড্রিঙ্কওয়েল কোম্পানি কর্মচারিদের ঠিকমত বেতনও পরিশোধ করছে না বলে জানাগেছে। বিগত ঈদের পূর্বে কর্মচারির। বেতন ও বোনাসের দাবিতে ঢাকা ওয়াসা ভবনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে।
এদিকে ঢাকা ওয়াসার বহুল আলোচিত 'ওয়াটার এটিএম' প্রকল্প নিয়ে নতুন করে বিতর্ক ও অসন্তোষ দানা বাঁধছে। বছরের পর বছর লোকসান গোনা, প্রশ্নবিদ্ধ চুক্তির কাঠামো এবং একটি নির্দিষ্ট বেসরকারি সংস্থাকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগের পরও প্রকল্পটি পুনরায় একই কায়দায় সচল করার প্রক্রিয়া চলছে। নিয়মনীতি, আর্থিক লাভ-ক্ষতির হিসাব কিংবা উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার তোয়াক্কা না করে প্রকল্পটিকে যেভাবে টিকিয়ে রাখা হচ্ছে, তাতে ওয়াসার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেই এটি এখন রসাত্মকভাবে 'স্বপ্নের রাজার কন্যা' হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
ওয়াসার সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য মতে, ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে ভবিষ্যতে যেকোনো নতুন প্রকল্প বা চুক্তি শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে 'ওপেন টেন্ডার' বা উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে হবে। কিন্তু সেই নীতিগত সিদ্ধান্তকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পর্দার আড়ালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান 'ড্রিঙ্কওয়েল'-এর সঙ্গেই আবারও সমঝোতা চালিয়ে যাওয়ার জোর প্রস্তুতি চলছে।
শুরুতেই ছিল শুভঙ্করের ফাঁকি। নাগরিকদের কম মূল্যে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের লক্ষ্যে ওয়াসা ও ড্রিঙ্কওয়েলের যৌথ উদ্যোগে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পপিপি) মডেলে এই ওয়াটার এটিএম প্রকল্পটি শুরু হয়। চুক্তির শর্ত ছিল:ওয়াসা বুথের সিভিল স্ট্রাকচার বা ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ করবে।
ড্রিঙ্কওয়েল অটোমেশন, ফিন্ট্রেশন প্রযুক্তি, স্মার্ট কার্ড ও সার্বিক অপারেশন পরিচালনা করবে। বুথ থেকে অর্জিত আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ উভয় পক্ষ ভাগাভাগি করে নেবে। কিন্তু বাস্তবে এই মডেলটি ওয়াসার জন্য চরম আর্থিক বিপর্যয় নিয়ে আসে। ঢাকা ওয়াসার নিজস্ব অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনেই স্বীকার করা হয়েছে, প্রকল্পটি শুরু থেকেই তীব্র লোকসানে চলছিল এবং লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, যেকোনো পিপিপি প্রকল্পে বাজারদর নির্ধারণ, উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা এবং বিকল্প প্রযুক্তির মূল্যায়ন করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু ড্রিঙ্কওয়েলকে কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে এই শর্তগুলো কতটা মানা হয়েছিল, তা নিয়ে ওয়াসার ভেতরেই রয়েছে বিস্তর প্রশ্ন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওয়াসার এক কর্মকর্তা বলেন, "প্রকল্পটি শুরু থেকেই একটি বিশেষ অদৃশ্য সুরক্ষার বলয়ের মধ্যে ছিল। এখানে নিয়ম-কানুন নয়, একটি বিশেষ পক্ষকে সুবিধা দেওয়াই ছিল মুল চালিকাশক্তি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সম্প্রতি ড্রিঙ্কওয়েলকে পুনরায় সুবিধা দিতে একটি নতুন ওয়াটার এটিএম ডিজাইন ও মডেল প্রস্তাব করা হয়েছে। এই নতুন মডেলে জালিয়াতি ও চতুরতা আরও বাড়ানো হয়েছে। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী: এবার বুথ নির্মাণের শতভাগ খরচ বহন করবে ঢাকা ওয়াসা। অর্থাৎ বিনিয়োগের পুরো ঝুঁকি থাকবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ঘাড়ে। আর ড্রিঙ্কওয়েল আগের মতোই বিনা পুঁজিতে কোনো ঝুঁকি ছাড়া কেবল অপারেশন পরিচালনা করে লাভের অংশ তুলে নেবে।
প্রকল্পটি বিগত দিনে লোকসানে থাকার পরও কেন একই ব্লুপ্রিন্ট ও একই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নতুন করে যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে, তা নিয়ে ওয়াসার ভেতরে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ ও অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। ওয়াসার অন্দরে দুই পক্ষের দ্বন্দ্ব বর্তমানে প্রকল্পটি নিয়ে ওয়াসার নীতি নির্ধারকদের মধ্যে স্পষ্ট দুটি গ্রুপ তৈরি হয়েছে। স্বচ্ছতার সপক্ষের গ্রুপ ড্রিঙ্কওয়েল সিন্ডিকেট ভেঙে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা চালু করা, নতুন প্রযুক্তি ও দেশীয় দক্ষ প্রতিষ্ঠানকে সুযোগ দেওয়া এবং বিগত বছরগুলোর আর্থিক ক্ষতির কারণ খুঁজে বের করতে অডিট করা উচিত বলে মনে করছেন। এবিষয়ে বক্তব্য জানার জন্যে ঢাকা ওয়াসার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ড্রিঙ্কওয়েল কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের টেলিফোনে সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি।
বিস্তারিত আসছে ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্বে!